শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৬
Shadow

দৃশ্যমান হলো স্বপ্নের পদ্মা সেতুর দ্বিতীয় স্পপ্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক  :

অবশেষে দৃশ্যমান হলো স্বপ্নের পদ্মা সেতুর দ্বিতীয় স্পপ্যান। স্প্যান ৭বি (সুপার স্ট্রাকচার) ৩৮ ও ৩৯ নং পিলারের ওপর বসিয়ে দেয়া হয়েছে। রবিবার সকাল সাড়ে আটটায় স্প্যানটি খুঁটির ওপর বসিয়ে দেয়া হয়। শনিবার থেকে স্প্যানটি খুঁটিতে বসানোর কাজ শুরু হলেও সন্ধ্যা ঘনিয়ে যাওয়ায় তা স্থগিত রাখা হয়। পরে রবিবার বেলা উঠতেই স্প্যানের কাজ শুরু হয়। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক আটটা ৩০ উঠতেই ৭বি নম্বর বিশাল স্প্যানটি পিলারের ওপর নেয়া হয় এবং সেট করার প্রক্রিয়া চলে। স্প্যানটি খুঁটির ওপর বসিয়ে দিলেও ক্রেন দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, পুরোপুরি ভার দেয়া হয়নি। প্রথম স্প্যানের মতোই আনুষঙ্গিক কাজ শেষ হওয়ার পর ক্রেনটি সরিয়ে নেয়া হবে। এরই মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। শীতের সোনালী রোদ উঁকি দিতেই পদ্মায় আলোর ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে। নতুন আরেক বড় ঝিলিক ছড়িয়ে যায় এই স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে।

দ্রুততর সময়ের মধ্যেই স্প্যান বসতে থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এদিকে দ্বিতীয় স্প্যান স্থাপনের খবরে আনন্দে উদ্বেল পদ্মা তীরের মানুষসহ গোটা বাংলাদেশ। বিভিন্নস্থান থেকে ফোনে ও গণমাধ্যম থেকে এই স্প্যান তোলার খবর নিশ্চিত হয় দেশবাসী।

বেয়ারিং ও লিফটিং ফ্রেমের (অস্থায়ী কাঠামোর) সঙ্গে এটি সেট করার প্রাথমিক কাজ বেলা ১২টায় সম্পন্ন হয়। তবে ৩৮ নম্বর খুঁটিতে স্থাপন করা ৭এ নম্বর প্রথম স্প্যানের সঙ্গের ওয়েল্ডিং করার পর এই লিফটিং ফ্রেম সরিয়ে নেয়া হবে। পরে এই লিফটিং ফ্রেম স্থাপন করা হবে ৩৯ নম্বর খুঁটিতে। অপেক্ষায় থাকবে ৭সি স্প্যানের জন্য। ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিয়ারে স্থাপন করা হবে ৭সি স্প্যান। এভাবেই লিফটিং ফ্রেম সরিয়ে আনা হবে। এখনও জাহাজটি ক্রেনে স্প্যানটি আটকানো অবস্থায় অপেক্ষা করছে। ওয়েল্ডিং সম্পন্ন হওয়ার পর পুরোপুরি সেট হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই জাহাজটি সরিয়ে নেয়া হবে। আজ সোমবার সকাল থেকে ওয়েল্ডিং শুরু হবে। দুই থেকে তিন দিন লাগবে ওয়েল্ডিং করতে।

ধূসর রঙের ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ হাজার ১৪০ টন ওজনের স্প্যানটি খুঁটিতে লেগে যাওয়ার পর পদ্মা সেতু এখন ৩০০ মিটার দৃশ্যমান হচ্ছে।

এরই মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় স্প্যান বসানো নিয়ে অপেক্ষারও অবসান ঘটল। প্রথম স্প্যানটি বসেছিল গত ৩০ সেপ্টেম্বর। তার প্রায় ৪ মাস পর দ্বিতীয় স্প্যান বসল। তবে এখন থেকে প্রতিমাসেই একাধিক স্প্যান বসানো সম্ভব হবে বলে দায়িত্বশীলরা মনে করছেন।

এবারে স্প্যান বসানো নিয়ে কোন আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। কোন সংবাদকর্মীকেও সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। প্রকৌশলীরা বলেছেন, প্রথম স্প্যান বসানোর সময় আনুষ্ঠানিকতা ছিল। এখন ঘন ঘনই স্প্যান বসবে। আনুষ্ঠানিকতা আর হবে না।

দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা জানান, শনিবার দিনভর কাজ এগিয়ে রাখার পর আজ সকালেই পিলারের ওপর স্প্যান তোলা সম্ভব হয়েছে। সেতুর এ অগ্রগতিতে খুশি পদ্মার দুপারের মানুষ।

স্প্যান স্থাপনের খবর শুনে ঢাকা থেকে আসা মনির হোসেন জানান, কাগজেকলমে অপেক্ষাটা ৪ মাসের। গেল বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম স্প্যানটি বসানোর পর থেকে।

কিন্তু এই একেকটি স্প্যান, যেগুলো জোড়া দিয়ে হবে পুরো ৬.১৫ কিলোমিটারের স্বপ্নের পদ্মা সেতু। প্রথম স্প্যানটি ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারে সহজে বসিয়ে দেয়া গেলেও দ্বিতীয়টি বসানোর পাশাপাশি জোড়া দিতে হবে প্রথমটির সঙ্গে। তাই ২০ জানুয়ারি মাওয়ার ইয়ার্ড থেকে স্প্যানবাহী ৩ হাজার ৬০০ টন ওজন বহনে সক্ষম ক্রেনটি রওনা দেয়। নানা কারণেই ৭ দিনের মাথায় শনিবার যথাযথ স্থানে নেয়া হয় স্প্যানবাহী জাহাজটি। পরদিন অর্থাৎ ৮ম দিনে স্প্যান পিলারের ওপর তুলতে সক্ষম হয়।

শনিবার স্প্যান বহনকারী ক্রেনের জাহাজটি খুঁটি থেকে মাত্র ২শ’ ফুট দূরে অবস্থান করে। স্প্যান বসনোর কাজে দায়িত্বরত সার্ভেয়ার মীর ফারুক হোসেন সিএসসি বলেন, ৩ হাজার ৬শ’ টন ধারণক্ষমতার ভাসমান ক্রেনের জাহাজ ‘তিয়ান ইয়াহাও’ স্প্যানটিকে পাঁজা করে ধরে খুঁটি দুটোর ওপর বসিয়ে দেয়। স্প্যানটি বসানোর আগে ওয়েট টেস্ট, বেজ প্লেট, দৈর্ঘ্য, পাইল পজিশন, ট্রায়াল লোড টেস্ট, মেজারমেন্টসহ আনুষঙ্গিক কিছু পরীক্ষা -নিরীক্ষা স¤পন্ন করা হয়। মীর ফারুক হোসেন জানান, স্প্যানটি শনিবার বসানোর কথা থাকলেও স্প্যানটি খুঁটির নিকটে পৌঁছতে পৌঁছতে দিনের আলো শেষ হয়ে যায়। আর স্প্যান বসানোর পরেও অনেক কাজ থাকে যা রাতে করা সম্ভব নয় বিধায় রবিবার সকালে বসানো হলো।

এ বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি অর্ধেকের কিছুটা বেশি। তাই নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ার ব্যাপারে শঙ্কা থাকলেও কাজের অগ্রগতিতে খুশি সাধারণ মানুষ। তারা বলেন, পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে আমাদের জন্য খুবই ভাল হবে। সময় বাঁচার পাশাপাশি বেঁচে যাবে নিরাপত্তার শঙ্কা। এর মধ্যে সেতুর ৪০ নম্বর পিলারটির কাজও পুরো শেষ করে আনা হয়েছে। মাওয়ার ইয়ার্ডে প্রস্তুত আছে আরও ৭টি স্প্যান, তাই আগামী মাসে চাইলে আরও একটি স্প্যান বসিয়ে দেয়া সম্ভব হবে।

পদ্মাপারের মানুষের  আনন্দ : ‘পদ্মা সেতুতে বসল দ্বিতীয় স্প্যান, আরেক ধাপ এগোল স্বপ্নের বাস্তবায়ন’। এমন খবর ছিল মানুষের মুখে মুখে।

রবিবার পদ্মা সেতুতে দ্বিতীয় স্প্যান (স্টিলের তৈরি অবকাঠামো) বসে গেলো। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সেতুর বাস্তবায়নের কাজ আরও একধাপ এগোল, অন্যদিকে পদ্মার দু’পারের মানুষের আনন্দ বাড়ল কয়েকগুণ। দলমত নির্বিশেষে এ অঞ্চলের সবাই এতে যে মহাখুশি সেটা বোঝা যায়, যখন এ প্রতিবেদক রবিবার সেতুতে দ্বিতীয় স্প্যান বসানো পরিদর্শনে গেলে স্প্যানবাহীবোট ভাড়া করে লৌহজং উপজেলা বিএনপির ১৫/১৬ নেতাকর্মীর একটি দলকে দেখতে পান। পরে তাদের এক নেতার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। লৌহজং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ স¤পাদক শাহিন মৃধা বলেন, পদ্মা সেতু আজ আমাদের জাতীয় উন্নয়নের অংশ। আওয়ামী লীগের সঙ্গে অনেক বিষয়ে মতানৈক্য থাকলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে সরকারকে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ায় ধন্যবাদ দিচ্ছি।

চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক : সুবল বিশ্বাস, জাজিরা থেকে ফিরে জানান, ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ববিবার সকালে মূল পিলারে ওপর দ্বিতীর স্প্যান বসানোর মধ্যে দিয়ে সেতুর ৩০০ মিটার অগ্রগতি হলো। ধারাবাহিকভাবে একের পর এক স্প্যান মূল পিলারের ওপর বসানোর জন্য জোরেশোরে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পদ্মাসেতু সংশ্লিষ্টরা। রবিবার ৮টা ৩০ মি. ৭বি নম্বর স্প্যানটি পিলারের ওপর নেয়া হয়। সেখানে এখন সেট করার প্রক্রিয়া চলছে। বেয়ারিং ও অস্থায়ী কাঠামোর সঙ্গে এটি সেট করা হচ্ছে। তবে ৩৮ নম্বর খুঁটিতে স্থাপন করা ৭এ নম্বর প্রথম স্প্যানের সঙ্গে ওয়েল্ডিং করার পর এই অস্থায়ী কাঠামো সরিয়ে নেয়া হবে। দূর থেকে দ্বিতীর স্প্যান বসানোর দৃশ্য দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠে নদী পারের মানুষ। স্বপ্ন বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখতে পেয়ে সবার চোখে মুখে ছিল আনন্দের ঝিলিক।