সোমবার, জানুয়ারি ১৮
Shadow

দক্ষ কর্মশক্তি বৃদ্ধিকল্পে চাকরীতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়াতে হবে

সোলায়মান মোহাম্মদ :

মিরাজ পিতামাতার তৃতীয় সন্তান। গ্রামের ছেলে হিসেবে ৬ বছর বয়সে স্কুলে যাওয়া শুরু করে সে। বাবা খুব স্বপ্ন নিয়ে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে মিরাজকে লেখা পড়া করাচ্ছে। ধীরে ধীরে মিরাজ প্রাইমারী, এসএসসি ও এইচএসসি সফলতার সাথে শেষ করে। এইবার উচ্চ শিক্ষার জন্য মিরাজ অর্থনীতি বিষয়ে ভর্তি হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটি কলেজে। পরিবারের অভাবের কারণে কোচিং বা ভালো কোনো গাইড বই ফলো করতে পারেনি। সে কারণে দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও পড়ার সুযোগ হয়নি। যাহোক তাতে মিরাজের মন খারাপ না কারণ সে বিশ্বাস করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে যে শিক্ষা অর্জন করবে তা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও অর্জন করতে পারবে। অন্যদিকে তার বিশ্বাস লেখাপড়া শেষে চাকরীর যে বিষয়টি সেখানে সে ভালো চাকরী পাবে কারণ তার মেধার উপর যথেষ্ঠ আস্থা রয়েছে। জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের ৪ বছরের অনার্স কোর্স করতে তার ৬ বছর লাগলো। সেশন জটের কারণে এই ২ বছর তার অতিরিক্ত বেশি সময় লাগলো। মিরাজ মাস্টার্সও শেষ করলো যেখানে তার রেজাল্ট ও সার্টিফিকেট পেতে আরো ২ বছর সময় অতিবাহিত হলো। উল্লেখ্য তার সবগুলো রেজাল্টই ভালো ছিলো। এদিকে পরিবার থেকে এইচএসসির পর থেকেই তার বাবা লেখাপড়ার খরচ দিতে পারেনি। টিউশনি করেই লেখাপড়ার খরচ বের করতে হয়েছে মিরাজকে। পরিবারের সবাই ভাবছে এবার তাদের মিরাজের লেখাপড়া শেষ ভালো চাকরী পাবে। পরিবারের অভাব কিছুটা হলেও কমবে।
পাঠকরা ভাবছেন হয়তো কোনো উপন্যাস বা গল্প বলবো! না কোনো গল্প নয় আলোচনার মূল বিষয় হলো চাকরীতে প্রবেশের বয়সসীমা। বিষয়টি সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্যই মিরাজ নামের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েছি। চলুন মূল আলোচনায় যাওয়া যাক। একজন মিরাজ দিয়েই পুরো জাতির লেখাপড়া শেষ করা চাকরী প্রত্যাশাকারী যুবদের কথা বিবেচনায় নিই। মিরাজ লেখাপড়া শুরু করে ৬ বছর বয়সে সুতরাং মাস্টার্স পর্যন্ত তার লেখাপড়া শেষ করতে বয়স গিয়ে দাঁড়ায় শুরু+প্রাইমারী+হাইস্কুল+কলেজ+অনার্স+মাস্টার্স অর্থ্যাৎ  ৬+৫+৫+২+৬+২=২৬ বছর। এটা হলো বাংলাদেশের শিশু শ্রেণী থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ করা সময়ের স্বাভাবিক একটি ছক। অনেক ক্ষেত্রে সেশনজট ছাড়াও ডিগ্রীগুলোর ফলাফল বা বিভিন্ন কারণেই আরো এক দু’বছর পার হয়ে যায়। সুতরাং একজন শিক্ষার্থীকে চাকরীর বাজারে উপযুক্ত হতে হলে ২৭ থেকে ২৮ বছর বয়স হতে হয়। কাজেই মিরাজের বয়স এখন ২৭ বছর। শুরু হলো মিরাজের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বিড়ম্বনা।

বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া সরকারি চাকরীতে প্রবেশের বয়সসীমা হলো ৩০ বছর। মিরাজের হাতে আছে মাত্র ৩ বছর। এই ৩ বছরের মধ্যেই মিরাজকে নিতে হবে কোনো সরকারি চাকরী, বাঁঁঁচাতে হবে পরিবার। পরিবারের সবাই মিরাজের চাকরী পাওয়ার আশায় দিনগুণছে। সঙ্গত কারণেই কিছু প্রশ্ন তৈরী হচ্ছে। মিরাজ কী এই বেঁধে দেওয়া ৩ বছরের মধ্যে পাবে সরকারি কোনো চাকরী, সে কী পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে পারবে? প্রতিযোগিতার এই সময়ে সরকারের সর্বোচ্চ ক্যাটাগরির চাকরী বিসিএস। এই বিসিএসে উত্তীর্ণ হতে হলে একজন শিক্ষার্থীকে কি পরিমাণ পড়াশুনা করতে হয়? ঠিক কি পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করতে হয়? একটি পদের জন্য কতজনের বিপরীতে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়? পাঠক বন্ধুরা সবাই এক বাক্যে হয়তো বলবে মিরাজকে ওই ২৭ বছরের জীবনে লেখাপড়া করতে ঠিক যতটুকু পরিশ্রম করতে হয়েছে বর্তমান চাকরীর বাজারে বিসিএস বা প্রথম শ্রেণীর চাকরী পেতে ঠিক ততটুকুই পরিশ্রম করতে হবে। তাহলে কি করে মিরাজ মাত্র ৩ বছরে সরকারি একটি ভালো চাকরীর প্রত্যাশা করতে পারে? আমার এক বন্ধু খুব মজা করে প্রায়ই বলে লেখাপড়া শেষ করতে করতে বয়স ২৮ হলো কবে চাকরী পাবো কবে বিয়ে করবো, কবে সন্তান হবে আর কবেই বা তাদের মানুষ করবো। যেখানে আমাদের গড় আয়ু মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ বছর। বন্ধুর কথাটি নিছক দুষ্টামীর ছলে বলা হলেও আমাকে ভীষণ করে ভাবিয়ে তোলে।

উন্নত বিশে^র দিকে তাকালে দেখা যায় বিশে^র অনেক দেশেই চাকরীতে প্রবেশের বেঁধে দেওয়া কোনো সীমা নেই। তবে ভারতে ৩৯, শ্রীলংকায় ৪৫ মালয়েশিয়ায় ৩৫ ফ্রান্সে ৪০ তাহলে কেবলমাত্র আমাদের দেশে কেনো ৩০ করা হলো। এই কারণে শুধু যে মিরাজের মতো মেধাবীরা চাকরী না পেয়ে হতাশ হয়ে অন্ধকার জগতের দিকে পা বাড়াচ্ছে তা কিন্তু নয়। দেশ হারাচ্ছে যোগ্য নেতৃত্ব, মেধাবী ও পরিশ্রমী দেশ বির্নিমান কারিগরদের। তাই চাকরীতে প্রবেশে বয়সের সীমা কমপক্ষে ৩৫ থেকে ৩৮ করা উচিৎ বলে মনে করি। রাষ্ট্রযন্ত্রকে এখনই ভাবতে হবে। উন্নত বিশে^র সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে যাদের দিয়ে সফলতাকে ছিনিয়ে আনা যাবে তাদেরকেই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বয়সসীমায় আবদ্ধ করে কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে দেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কেবলমাত্র স্বপ্নই দেখতে পারবো কিন্তু বাস্তবে তা দু:স্বপ্ন হয়ে থাকবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.