শুক্রবার, এপ্রিল ২৩
Shadow

ক্ষমতা হারানোর শঙ্কায় শিক্ষায় অনুৎসাহ ও জুমচাষে উৎসাহ দিয়ে থাকেন চাকমা রাজারা

নিজস্ব প্রতিবেদক  :

ব্রিটিশ শাসনামলে চিটাগাং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন ১৯০০ আইন বা চিটাগাং হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েল- এর ক্ষমতাবলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি- এই তিনটি সার্কেল বা অঞ্চলে বিভক্ত করে ব্রিটিশরা। সেই থেকে চালু হয় সার্কেল প্রথা। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত এই অঞ্চলের প্রধানরা সার্কেল চিফ নামেই অভিহিত হয়ে আসছে, এমনকি ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতেও তাদের সার্কেল চিফই বলা হয়েছে। কিন্তু নিজ সার্কেলে বসবাসকারী জনগণের কাছে তারা নিজেদেরকে রাজা বলেই পরিচয় দেয়, যা Chittagong Hill Tracts Regulation 1/1900- এর ৩৫ নং আইন এবং অন্যান্য বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিধিসম্মত নয়।

আর এই প্রথাগত পদ ও ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে তারা নিজেদের পরিবারকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করলেও উপজাতি সমাজে শিক্ষা বিস্তারে অনুৎসাহিত ও ক্ষেত্র বিশেষে বাধা প্রদান করে ঐতিহ্য রক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দোহাই দিয়ে পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর জুম চাষে বেশি মনোযোগী হতেই উৎসাহ প্রদান করে থাকে।

ব্রিটিশ আমল থেকেই বিভিন্ন সময় ও মেয়াদের সরকার ধারাবাহিকভাবে পার্বত্যাঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে বাধার সম্মুখীন হয়ে এসেছে। প্রথম দিকে ব্রিটিশরা তাদের শাসন কার্য পরিচালনার সুবিধার্থে কিছুসংখ্যক পাহাড়িকে শিক্ষিত করার উদ্যোগ নিয়ে চাকমা রাজপরিবার কেন্দ্রীক অভিজাতদের বাধার মুখে পড়ে। ফলে তারা এটা শুধুমাত্র রাজপরিবার ও অভিজাত পাহাড়িদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের চরম সত্য হলো, ব্রিটিশরা ১৯৩৭-৩৮ খ্রিস্টাব্দে পাহাড়ে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান চালু করেও এই কথিত রাজাদের বাধার কারণে তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।

বর্তমান রাঙামাটি হাইস্কুলও সাধারণ পাহাড়িদের শিক্ষিত করার ব্রত নিয়ে ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হলেও প্রথম দিকে সাধারণ পাহাড়িরা সেখানে তেমন একটা সুযোগ পেতো না। বর্তমান চাকমা সার্কেল চিফের পূর্ব-পুরুষ ভূবন মোহন রায়ের পরিবার ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের ইচ্ছার বাইরে কেউই এই প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেতো না।

১৯৬৬ সালে যে রাঙামাটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় সেটি স্থাপনও সহজ কাজ ছিল না। কারণ তৎকালীন চাকমা সার্কেল চিফ আত্মস্বীকৃত রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী ত্রিদিব রায় রাঙামাটিতে কলেজ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হননি বরং এটি যাতে কোনভাবেই বাস্তবায়িত হতে না পারে সে চেষ্টাও করেছিলেন। এর জন্য তিনি প্রথমে ঢাকার রাজস্ব বোর্ডের সদস্য এস এম হাসানের কাছে এবং পরবর্তীতে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার করিম ইকবালের কাছে রাঙামাটিতে কলেজ স্থাপনের প্রয়োজন নেই এবং তার জমি (যদিও জায়গাটি চিফের জন্য নির্ধারিত জমির মধ্যে ছিল না) জোর করে নিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বলে মিথ্যে অভিযোগ জানিয়ে চিঠি লিখেন। কিন্তু অনেক বাধা পেরিয়ে তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার সিদ্দিকুর রহমানের দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত কলেজটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় সাধারণ পাহাড়িদের শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭৬ সালের ২৫ মার্চ উপজাতি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা বরাদ্দ এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর আলোকে ১৯৭৮ সালে বৈদেশিক বৃত্তি প্রদানের জন্য উপজাতিদের মধ্য থেকে দরখাস্ত আহ্বান করা হলে তৎকালীন চাকমা রাজমাতা বিনীতা রায় যোগ্য এবং সাধারণ উপজাতিদের বাদ দিয়ে ৭ জনের একটি লিস্ট জমা দেন যাদের প্রত্যেকেই ছিলেন চাকমা রাজপরিবারের সদস্য।

এছাড়া চাকমা রাজপরিবার কর্তৃক সাধারণ পাহাড়িদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের পথে অন্তরায় সৃষ্টির আরো অনেক নির্মম ইতিহাস পাওয়া যাবে অঙ্কুর প্রকাশনী থেকে ২০০২ সালে প্রকাশিত শরদিন্দু শেখর চাকমার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আমার জীবন (প্রথম খন্ড)’ এর পাতায় পাতায়।

মূলত দেশীয় আইনে স্বীকৃত সার্কেল প্রথার বিপরীতে নিজেদের স্বার্থে সাধারণ জনগোষ্ঠীর উপর প্রভাব প্রতিপত্তি বজায় রাখতে কথিত রাজারা শুধু নিজ জনগোষ্ঠীকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বাধাই নয় বরং তাদেরকে অনুৎসাহিতকরণের মাধ্যমে ঐতিহ্য রক্ষা ও মিথ্যে অর্থনৈতিক উন্নতির কথা বলে সরকার প্রদত্ত বিকল্প ও অধিক লাভজনক বহুমুখী চাষ পদ্ধতি ‘ক্রিক’- এর বিপরীতে পাহাড় ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর জুম চাষে উৎসাহিত করে থাকেন যা প্রকৃত পক্ষে পাহাড়িদের ভাগ্য পরিবর্তন নয় বরং জুম খাজনা আদায়ের অনুষ্ঠানের কথিত ‘ঐতিহ্যবাহী’ রাজ পুণ্যাহ পালনের মাধ্যমে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রমাণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কৌশলমাত্র।