শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৬
Shadow

ঐতিহ্য হারাচ্ছে গফরগাঁওয়ের ব্রহ্মপুত্র, হুমকীর মুখে ২ সেতু

আব্দুল আজিজ :

ব্রহ্মপুত্র এশিয়া মহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। সংস্কৃত ভাষায় ব্রহ্মপুত্রের অর্থ হচ্ছে “ব্রহ্মার পুত্র। ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি হিমালয় পর্বতমালার কৈলাস শৃঙ্গের নিকট জিমা ইয়ংজং হিমবাহে, যা তিব্বতের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। সাং পো নামে তিব্বতে পুর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে এটি অরুণাচল প্রদেশে ভারতে প্রবেশ করে যখন এর নাম হয়ে যায় সিয়ং। তারপর আসামের উপর দিয়ে দিহং নামে বয়ে যাবার সময় এতে দিবং এবং লোহিত নামে আরো দুটি বড় নদী যোগ দেয় এবং তখন সমতলে এসে চওড়া হয়ে এর নাম হয় ব্রহ্মপুত্র। তারপর এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মেশে। উৎপত্তিস্থল থেকে এর দৈর্ঘ্য ২৯০০ কিলোমিটার। ব্রহ্মপুত্রের প্রধান শাখা হচ্ছে যমুনা।। আসামের ধুবড়ি থেকে নেমে দক্ষিণ-পূর্বমুখী কুড়িগ্রামের চিলমারী হয়ে ফুলছড়ি, হরিচন্ডি, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের খোলাবাড়ি এলাকার যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ। সেখান থেকে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, জামালপুর সদর, ময়মনসিংহ জেলা সদর। ঈশ্বরগঞ্জ, ত্রিশাল, নান্দাইল হয়ে গফরগাঁয়ে প্রবেশ করেছে। এক সময়ে গফরগাঁয়ের কৃষি ব্রক্ষপুত্র নদের উপর নির্ভরশীল থাকলেও নানা কারনে এখন ব্রক্ষপুত্র হুমকীর মুখে।

সময়ের বিবর্তনে উত্তাল ব্রহ্মপুত্র নদ হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতির পাতায়। ভয়াবহ নাব্য সংকট ব্রহ্মপুত্রকে বিপর্যন্ত করে তুলছে। নদের অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয়সহ কৃষি আবাদ, সেচ সংকটে নেমে এসেছে ভয়াবহ স্থবিরতা। নদের তলদেশে পানি না থাকায় সেচনির্ভর কৃষকরা পড়েছে মহাসংকটে।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে,বক্ষপুত্র নদে বিগত শত বছরেও কোনো ড্রেজিং না করায় এর তলদেশে পলি জমে নাব্য হ্রাস পেয়ে উত্তাল নদ মরতে বসেছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্যসহ মৎস্য সম্পদ ও নানা জলজ প্রাণী। হাজার হাজার জেলে পরিবার বেকারত্ব ঘোচাতে বেছে নিয়েছে অন্য পেশা। খেয়াপাড়ের মাঝিরা বৈঠা ছেড়ে কলের নৌকা চালিয়েও শেষাবধি রক্ষা পাচ্ছেনা। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শাখা নদীগুলো এখন বিত্তবানদের ফসলি জমি। বিত্তবান কৃষকরা গভীর নলকূপ বসিয়ে সেচ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা নগদ টাকা দিতে পারছেন তারাই শুধু পানি পাচ্ছেন। এ সুযোগে এক শ্রেণীর মহাজন চড়া সুদে হাতিয়ে নিচ্ছে কৃষকের কষ্টার্জিত ফসলের টাকা।

মটখোলা, টোক থেকে হোসেনপুর, গফরগাঁও ও ময়মনসিংহ জামালপুর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদ এখন প্রায় বিলীন হতে চলেছে। পানির প্রবাহ না থাকায় নদের তলদেশে চলছে চাষাবাদ। এ সুযোগে এক শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাকে কৌশলে ম্যানেজ করে বিশেষ প্রভাবশালী মহল কোটি কোটি টাকার বালু ও মাটি অবৈধভাবে বাণিজ্য করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন। ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিরাট অঙ্কের রাজস্ব অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে ব্রিজ কালভার্ট। নাব্য সংকটের কারণে শুকনো মৌসুমে নৌকা চলাচলসহ পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়েছে।

ইতিহাসবিদরা জানান,তৎকালীন বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে নৌবহর নিয়ে গফরগাঁও হোসেনপুর এলাকা দিয়ে যাতায়াত করতেন। এ ছাড়াও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌবহর ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে নিয়মিত টহল ও রসদ সরবরাহের নিরাপদ পথ হিসেবে ব্যবহার করত। এই নদকে ব্যবহার করে হোসেনপুরে তারা নীলকুঠিও স্থাপন করেছিল।

তাই স্থানীয়দের দাবী ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার কৃষকদের বাঁচাতে ব্রহ্মপুত্র নদ ড্রেজিং করার উদ্যোগ গ্রহন করবে।

থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষে ব্রহ্মপুত্র নদ প্রবাহিত। ওই নদে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় খুরশিদ মহল সেতু এখন হুমকির মুখে পড়েছে। হোসেনপুর-গফরগাঁও সড়কে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর খুরশিদ মহল সেতু এলাকার জনস্বার্থে নির্মিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেতু ২ কিলোমিটার এলাকার মধ্য থেকে বালু উত্তোলন করা সম্পূর্ণ নিষেধ থাকা সত্তেও এলাকার কতিপয় প্রভাবশালী চক্র নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ব্রীজ সংলগ্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজের যোগসাজশে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বালু উত্তোলন করে লুটপাটের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছে।

তাদের মতে, গফরগাঁও উপজেলা ও পাগলা থানাধীন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে প্রতি বছর কয়েক কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হয়। ব্রহ্মপুত্র নদে বালু উত্তোলনের জন্য প্রতি বছর বালু মহাল ইজারা ডাকের ব্যবস্থা থাকলেও ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর খুরশিদ মহল সেতুর ২ কিলোমিটার এলাকায় বালু উত্তোলন করা ময়মনসিংহ সড়ক ও জনপথ বিভাগ কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরও এক শ্রেণীর অসাধু বালু ব্যবসায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সেতু সংলগ্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে।

গফরগাঁওয়ে বালু উত্তোলনে হুমকির মুখে দুই সেতু

বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার এলাকাবাসীর দূর্ভোগের কথা বিবেচনা করে গফরগাঁওয়ের ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মাণ করেন সালটিয়া-হাজীগঞ্জ-দেওয়ানগঞ্জ এবং গফরগাঁও-হোসেনপুর সড়কের খুরশিদ মহল সেতু। কিন্তু এই দুই সেতু ঘিরে এখন চলছে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। এতে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত সালটিয়া-হাজীগঞ্জ-দেওয়ানগঞ্জ এবং ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গফরগাঁও-হোসেপুর সড়কের খুরশিদ মহল সেতু। সরকারি ইজারা নীতিমালা তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগায় এ বালু উত্তোলন করলেও স্থানীয় প্রশাসন অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে।

এ সুযোগে প্রভাবশালী মহল সিন্ডিকেট তৈরি করে কোটি-কোটি টাকার বালু ও মাটি অবৈধভাবে উত্তোলন করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছে। এতে একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিরাট অংকের রাজস্ব অন্যদিকে হুমকির মুখে রয়েছে এলাকার ব্রিজ কালভার্ট। শুকনা মৌসুমে পানি কমে গেলে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল দখল নিতে প্রতি মৌসুমেই মারামারিতে প্রাণহানি ঘটে। ফলে ব্রহ্মপুত্রের খাস জমি ও বালু ব্যবসার আদিপত্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক অসন্তোষ বেড়েইে চলছে।