বুধবার, এপ্রিল ১৪
Shadow

ইজাজ মিলনের ১৯৭১: গণহত্যা ও রক্ত ছবির মর্মস্পশী নকশা

 

সোহেল মাজহার :

মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। এ অর্জনের পিছনে আছে অনেক অশ্রæ রক্ত প্রবাহের ইতিহাস। লক্ষ লক্ষ মানুষের আতœত্যাগ, জীবন বিসর্জন, মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর অনি:শেষ বেদনা বহন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। বাঙালি জাতি কি নির্মম হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, ধ্বংসস্তুপ মৃত্যু নদী পার হয়ে স্বাধীনতার লাল সূর্যের দেখা পায়, সেই ইতিহাস রচনায় কিছু অগ্রবর্তী তরুণ কাজ করে যাচ্ছেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রবর্তিত ‘ বজলুর রহমান স্মৃতিপদক’ চ্যানেল আইয়ের সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক ইজাজ আহমেদ মিলন তাদের অন্যতম।

ইজাজ আহমেদ মিলন মূলত একজন কবি ও গল্পকার। কাজ করছেন সমকালের গাজীপুর প্রতিনিধি হিসাবে। নিজের মধ্যে লালন করেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বপ্ন দেখেন শোষণ সাম্প্রদায়িকতা, মুখ্য সমঅধিকারের স্বনির্ভর বাংলাদেশের। ইতিহাসের দায়বোধ তাকে অনুপ্রাণিত করে। সেই দায়বোধ থেকেই তিনি চারণের বেশে শ্রীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আতœীয় প্রতিবেশি পরিবার পরিজন প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে অনেক না জানা ঘটনা আবেগ স্পর্শী ভাষায় রচনা করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সেই সব দিনগুলিতে জাতির পিতা স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহŸানে সমগ্র বাঙালি জাতি আলোড়িত হয়। গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শ্রেণী পেশা নির্বিশেেেষ সকল মানুষ বঙ্গবন্ধুর আহŸানেই মুক্তির মন্ত্র উজ্জিবিত হয়। ইজাজ আহমেদ মিলনের ভাষায় “২৬ মার্চের ঘটনা। দুপুরে তিনি খেতে বসেছেন। খবর এল বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কি বেঁচে আছেন ? পাক সেনারা কি তাঁকে গ্রেফতার করেছে ? কিছুই জানা গেল না দুপুর পর্যন্ত। পরে জানতে পারলেন ২৫ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হয়েছেন পাকবাহিনীর হাতে। কিন্তুু গ্রেফতারের আগেই রাত ১টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার সেই ঘোষণা প্রদান করেন। সেই ঘোষণা পত্র রাত্রেই চট্টগ্রামে পৌঁছায় এবং স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র (পরে বিল্পবী শব্দটি বর্জন করা হয়) থেকে বহুবার পাঠ করে শোনান। পৃ: ৪০

মূলত এভাবেই সমগ্র বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে উজ্জিবীত হয়। ২৬ মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার খবরে সমগ্র জাতি ক্ষোভে ঘৃণায় ফেটে পড়ে; স্বস্ফুর্ত ভাবে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধ গতানুগতিক পর্যায়ের কনভেনশানাল যুদ্ধ কিংবা শুধুমাত্র গেরিলাযুদ্ধ ছিল না, ছিল সর্বব্যপ্তি। স্বতঃস্ফুর্ত গণযুদ্ধ। তাই ১২ এপ্রিল, স্বতঃস্ফুর্ত গণযুদ্ধের অংশ হিসাবে ৭১ সালের ১২ এপ্রিল শ্রীপুরের গণ মানুষ শ্রীপুর রেল লাইন তোলার প্রস্তুতি নেয়। সেদিন রেল তোলার কর্মকান্ডে অনেকর সাথে আব্দুল হালিম ও তহিজ উদ্দীনও ছিলেন। লেখকের কলমে ঘটনার মর্মছোঁয়া বর্ণনা ওঠে আসে এভাবে- “সবুজ ঘাসের ওপর লাল রক্ত। ছোপ ছোপ রক্ত। ছটফট করতে করতে এক সময় (অল্পক্ষণ পরেই) নিস্তেজ হয়ে যায় উদ্যমী ওই দুই দেহ। দূর থেকে কেউ কেউ এই দৃশ্য দেখেন। কিন্তু কিছুই করার ছিল না তখন। এরই ফাঁকে এক সময় গুলিবিদ্ধ শরীর থেকে প্রাণ বেরিয়ে যায়। রক্তে ভেজা নিথর নিস্তব্ধ দুটি দেহ পড়ে থাকে সবুজ ঘাসের ওপর। প্রথম অবস্থায় তাদেরকে সনাক্ত করতে না পারলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচয় মেলে শহীদ তহিজ উদ্দিন ও আব্দুল হালিমের। পৃঃ ৭৬

ইজাজ মিলন মুক্তিযুদ্ধের বিস্মৃত ঘটনার টুকরো টুকরো অংশ ব্যক্তি মানুষের অবেগ, অনুভূতি, স্মৃতি-বিস্মৃতির খুব সাধারণ দৃশ্যকাব্য ভাষার মর্ম-স্পর্শী বর্ণান দিয়ে এমন ভাবে গ্রন্থিত করেছেন, সেগুলি আর সাধারণ মানুষের ব্যক্তিক ও পারিবারিক দুঃখ স্মৃতি হিসাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে থাকে নি, হয়ে ওঠেছে একটি জাতির অভ্যুদয়ের রক্তাক্ত দলিল। জাতির কাছে তাই গ্রন্থটির মূল্য রক্ত অশ্রæ আতœ-ত্যাগের মহান গাঁথা হিসাবে চিরভাস্বর। দেশা মাতৃকার আহŸানের কাছে পিতৃত্বের আবেগও সেদিন খুব গৌণ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। লেখকের ভাষায়- “১৯৮৭১। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে কোনো একদিন। দুই বছরের শিশুপুত্র মাহবুবুল অলম বুলু’র কপালে চুমু খেয়ে বাড়ি থেকে বের হলেন শামসুদ্দিন। করেন মাহন মুক্তিযুদ্ধে। স্ত্রী আনোয়ারা বলেন, দুধ ভাত খুব প্রিয় ছিল তার। সাথে কলা। আমাদের একটা গাভী ছিল। খুব সকালে উঠে রান্না শেষ করেছি। গাভীর দুধ দিয়ে ভাত দিলাম।— যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করছিলাম। তিনি শুনলেন না। অনেকটা অভিমান করে সেদিন তার সাথে খেতে বসিনি। আমি বসেনি বলে তিনিও আর খেলেন না।” পৃ: ৩২

মিলন শ্রীপুরের রক্ত দলিলের নকশা আঁকতে গিয়ে শ্রীপুরের ভৌগলিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছেন, তা কিন্তুু নয়। ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা, পূর্বাপর ঘটনা প্রবাহ ও তার ধারাবাহিক পরস্পরা বজায় রাখতে যেয়ে শ্রীপুরের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধ দৃশ্যের ছবিও একঁছেন। যেমন তিনি প্লাটুন সমাহার জহিরুল ইসলাম সোবেদ ( জেড.আই. সোবেদ) কাওরাইদের মনিরুদ্দিন ফকির, বরমীর আবদুল মান্নান ফকির, শ্রীপুরের ইসলাম চেয়ারম্যান, ৩নং সেক্টরের সেকেন্ড ইনকমান্ডার ও ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আগড়তলার লেম্বুছড়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও হাপানিয়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ভূমিকা বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সংগঠকদের ভূমিকা ও লেখক যথাযথ ভাবে তুলে ধরেন। লেখকের ভাষায়- “মাজম আলীর মৃধার বাল্যবন্ধু ধনুয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম বলেন ‘ ৭০- এর নির্বাচনপূর্ব এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয় ধনুয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় (সাতানী) মাঠে। এ-দিন নির্বাচনী জনসভা লোকে লোকরণ্য ছিল। শহীদ মাজম আী, শহীদ জামাল উদ্দীনসহ এলাকার যুবক ও ছাত্ররা সেদিন এ জনসভায় অংশগ্রহণ নিয়েছিলেন। মূলত এ জনসভায় নেতাদের ভাষণ শোনে মাজম আলী উদ্ধুদ্ধ হয়েছিলেন। তার মতো অনেকের ভেতরেই দেশপ্রেমের বীজ নতুন করে গজিয়ে উঠে।” পৃ: ১০৮

লেখক শুধুমাত্র ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের ওপর নির্ভর না করে, শ্রীপুরের ইতিহাস ঐহিত্য বরেণ্য ব্যক্তিদের স্মৃতিকথা ও ডায়েরীর উপরও নির্ভর করেছেন। আমরা দেখি তিনি শহীদ আব্দুল বাতেন আকন্দের কথা বলতে যেয়ে বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরীরর সাহায্য নিয়েছেন। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরী : চতুর্থ খন্ডের ২২৬ পৃষ্ঠায় সেই বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

মহান মুক্তিযদ্ধে সন্তানদের মৃত্যু কিংবা অর্ন্তধান বাবা মার মনে কি প্রকর মানসিক অভিখাত সৃষ্টি করে তা ভাষায় প্রকাশ করা কষ্টসাধ্য বিষয়। এ রকম ঘটনা লেখক উল্লেখ করেছেন এভাবে- “স্বাধীনতা সংগ্রামে ছেলে মোফাজ্জল হোসেনের আতœাদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭২ সালের ১১ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের ভিটিপাড়া গ্রামের কাঠমিস্ত্রি বাবা আবুল হোসেনের কাছে এই চিঠি পাঠান। বঙ্গবন্ধুর পাঠানো চিঠি বুকে নিয়ে বছরের পর বছর ছেলের লাশ খুঁজেছেন শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের বাবা আবুল হোসেন ও মা হাজেরা খাতুন। কোথাও পাননি আদরের মানিক মোফাজ্জলের লাশ! ছেলের জন্য চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিল হাজেরার। কাঁদতে কাঁদতে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। হারিয়ে ফেলেছিলেন মানসিক ভারসাম্য”। পৃষ্ঠা: ৪৪

এ ঘটনার বিবরণে একথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র বাংলাদেশে যুদ্ধে নিহত ও শহীদের জন্য দুই হাজার টাকা করে সম্মানি বরাদ্দ করেছেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি পত্র প্রদান করেছেন। যা পরিবারের অমূল্য স্মারক সম্পদ হিসেবে গন্য। অন্যত্র আবার তিনি একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শাহাবউদ্দীন আহমদের কথা বলতে গিয়ে মূলত ইজ্জতপুর রেলওয়ে ব্রীজের যুদ্ধ ঘটনার মর্মস্পর্শী বর্ণনা তুলে ধরেন। সেই যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াই করে ব্রাশফায়ারে নিহত হন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শাহাবউদ্দীন আহমদ।

এমন বহু অজানা অধ্যায় গ্রন্থটিতে বর্ণিত হয়েছে যা আমাদের ইতিহাস চর্চায় গবেষকদের কাজে লাগবে। বইটির ভূমিকা লিখেছেন বরেণ্য সাংবাদিক দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার। তিনি পাÐুলিপি পড়ে আবেগাপ্লত হয়েছেন, অশ্রƒপাত করেছেন সে কথাও লিখেছেন ভূমিকায়।

১৯৭১: বিস্মৃত সেই সব শহীদ

লেখক: ইজাজ আহমেদ মিলন

প্রচ্ছদ : রাজিব রায়

প্রকাশনী: প্লাট ফর্ম,

পৃষ্ঠা: ১২০

সোহেল মাজহার

Leave a Reply

Your email address will not be published.